গাজীপুর,
গাজীপুরের কালিয়াকৈর থেকে মাওনা চৌরাস্তা পর্যন্ত প্রায় ২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক। সড়কের দুই পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা গজারি ও শালবন, আর মাঝখান দিয়ে আঁকাবাঁকা কালো পিচের পথ, দূর থেকে দেখলে যেন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে ভয়াবহ বিপদ। স্থানীয়দের কাছে কালিয়াকৈর-মাওনা সড়কটি এখন যেন এক ‘মৃত্যুফাঁদ’।
স্থানীয়দের দাবি, গত দেড় বছরে এ সড়কে শতাধিক দুর্ঘটনায় অন্তত ৫০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও শতাধিক মানুষ। প্রায় প্রতি মাসেই সড়কটি থেকে ভেসে আসে প্রাণহানির খবর। এরপরও সড়কটি নিরাপদ করতে দৃশ্যমান ও কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। সর্বশেষ গত শনিবার সকাল ৯টার দিকে কালিয়াকৈর থেকে পাঁচ যাত্রী নিয়ে মাওনা চৌরাস্তার দিকে যাচ্ছিল একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা। কাঞ্চনপুর চেয়ারম্যানবাড়ি এলাকার একটি অন্ধ বাঁকে পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা দ্রুতগতির একটি কাভার্ডভ্যানের সঙ্গে অটোরিকশাটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে অটোরিকশাটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই চালকের মৃত্যু হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর ফুলবাড়িয়ার গৃহবধূ রোজিনা আক্তার (৩৫) ও তাঁর ৮ বছরের ছেলে রাফিসহ আরও তিনজনের মৃত্যু হয়।
নিহত রোজিনার স্বামী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, সকালে বাজার করতে বের হয়ে তাঁর স্ত্রী ও সন্তান আর ঘরে ফেরেননি। এই সড়ক তাঁদের সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। দুর্ঘটনার প্রধান কারণ সড়ক বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, কালিয়াকৈর-মাওনা সড়কে দুর্ঘটনার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। এর মধ্যে অন্যতম হলো সড়কটির সরু আকৃতি। গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের বেশিরভাগ অংশের প্রস্থ মাত্র ২০ থেকে ২৫ ফুট। ফলে দুটি বড় যানবাহন পাশাপাশি চলাচলের সময় ঝুঁকি তৈরি হয়।
এ ছাড়া প্রায় ২৮ কিলোমিটার সড়কে রয়েছে ১৮ থেকে ২০টি বিপজ্জনক অন্ধ বাঁক। ঘন গজারি বনের কারণে এসব বাঁকে বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহন ১০ গজ দূর থেকেও অনেক সময় দেখা যায় না। ফলে চালকরা হঠাৎ করে সামনে যানবাহন দেখতে পেয়ে নিয়ন্ত্রণ হারান। অন্যদিকে, ফাঁকা সড়ক হওয়ায় অনেক যানবাহন ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার বা তারও বেশি গতিতে চলাচল করে। এর সঙ্গে মাটিবাহী ট্রাক থেকে সড়কে পড়ে থাকা মাটিতে বৃষ্টির পানি জমে রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
সড়কের বাঁকগুলোতে পর্যাপ্ত রিফ্লেক্টর, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, স্পিড ব্রেকার ও রাতের আলোর ব্যবস্থা না থাকাও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সন্ধ্যার পর বাড়ে ডাকাতির আতঙ্ক, শুধু দুর্ঘটনা নয়, বনঘেরা ও নির্জন হওয়ায় সন্ধ্যার পর এই সড়কে ডাকাতির আতঙ্কও রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। স্থানীয় বাসিন্দা সোলেমান হোসেন বলেন, তাঁদের পাশের বাড়ির দুইজন এই সড়কে প্রাণ হারিয়েছেন। দ্রুত সড়কটি প্রশস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো পরিষ্কার না করলে মৃত্যুর মিছিল থামবে না।
চালক জামাল হোসেন ও মো. ইমরান হোসেন বলেন, প্রতিদিন প্রাণ হাতে নিয়েই তাঁদের গাড়ি চালাতে হয়। বিশেষ করে বাঁকের অপর পাশ দেখা না যাওয়ায় যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই বাঁকগুলোতে গতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রিফ্লেক্টর ও সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন জরুরি। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের গাজীপুর জেলা সভাপতি জানান, নিয়মিত প্রাণহানির প্রতিবাদে তাঁরা মানববন্ধন ও স্মারকলিপি দিয়েছেন। কিন্তু এখনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তিনি সিএনজি চলাচল বন্ধ করে এ রুটে বাস চালুর দাবি জানান। দ্রুত সংস্কার ও প্রশস্তকরণের দাবি
কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, সড়কটি অত্যন্ত দুর্ঘটনাপ্রবণ। প্রায় দুই-তিন সপ্তাহ পরপরই এ সড়ক থেকে লাশ উদ্ধারের ঘটনা ঘটছে। চলতি সপ্তাহেও একটি ট্রাক উল্টে খাদে পড়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। পুলিশ নিয়মিত টহল দিলেও সড়কের কাঠামোগত সমস্যার কারণে দুর্ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। তিনি দ্রুত সড়কটি প্রশস্ত ও আলোকিত করার দাবি জানান। গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মজিবুর রহমান সড়কটিকে ‘মৃত্যুফাঁদ’ আখ্যা দিয়ে বলেন, দেড় বছরে ৫০ জনের প্রাণহানি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সড়কটি চার লেনে সম্প্রসারণের জন্য ইতোমধ্যে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বন বিভাগের সঙ্গে গাছ কাটার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
তিনি আরও জানান, চলতি অর্থবছরের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলোতে রিফ্লেক্টর, সাইনবোর্ড ও লাইট স্থাপনের জন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সিএনজি চলাচল বন্ধ করে বিআরটিসি বাস চালুর দাবিও সংসদে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। জয়দেবপুর সড়ক বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. তারিক হোসেন জানান, সংসদ সদস্যের ডিও লেটারের পর সড়কটি সম্প্রসারণের নকশার কাজ শুরু হয়েছে। তবে অধিকাংশ এলাকায় বন বিভাগের গাছ ও জায়গা থাকায় কাজটি জটিল হয়ে পড়েছে।
গাজীপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর আহমেদ বলেন, চলতি অর্থবছরের মধ্যেই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলো সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে দুর্ঘটনা কমাতে চালকদেরও বাঁকে গতি কমিয়ে গাড়ি চালাতে হবে।
সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্ঘটনা কমাতে দ্রুত সড়কটি চার লেনে সম্প্রসারণ, বিপজ্জনক বাঁকে রিফ্লেক্টর ও সাইনবোর্ড স্থাপন, রাস্তার পাশে ঝোপঝাড় পরিষ্কার, পর্যাপ্ত স্ট্রিট লাইট স্থাপন এবং পুলিশ টহল বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি সিএনজি চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে গণপরিবহন ব্যবস্থা জোরদারের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা।
সবুজ গজারি বনের আড়ালে থাকা এই সড়কের প্রতিটি বাঁক যেন নতুন কোনো দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন আর কত প্রাণ গেলে কালিয়াকৈর-মাওনা সড়কটি নিরাপদ ও প্রশস্ত করার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে?
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন