মোঃ আমিনুল ইসলাম
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে গ্রামবাংলার শত বছরের ঐতিহ্যবাহী লোকজ গান ‘পদ্মা পুরাণ’ আয়োজনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। অনুষ্ঠান চলাকালে এক যুবকের বাধা ও ফেসবুক লাইভে আপত্তিকর মন্তব্যের অভিযোগে গান বন্ধ হয়ে যায়। পরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে পরদিন সীমিত পরিসরে অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন করা হয়। ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার হুগলবাড়ী ইউনিয়নের শালিমপুর গ্রামে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি ওই এলাকায় সাপের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় গ্রামীণ লোকবিশ্বাস ও প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী সাপের উপদ্রব থেকে পরিত্রাণের আশায় মুন্নি খাতুনের উদ্যোগে ‘পদ্মা পুরাণ’ বা ‘মনসামঙ্গল’ গানের আয়োজন করা হয়।
শুক্রবার সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান চলাকালে স্থানীয় যুবক শরিফুল ইসলাম শরীফ ফেসবুক লাইভে এসে এর বিরোধিতা করেন বলে অভিযোগ ওঠে। তিনি সংস্কৃতির নামে কুসংস্কার ছড়ানোর অভিযোগ তুলে অনুষ্ঠান বন্ধের দাবি জানান। একপর্যায়ে গান বন্ধ হয়ে গেলে আয়োজক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। আয়োজক মুন্নি খাতুন বলেন, “আমি মাঝেমধ্যে স্বপ্নে দেখি, বেশ কিছু সাপ এসে আমাকে কামড়াতে যাচ্ছে। বিষয়টি আমার মা জানার পর স্থানীয় ওঝার পরামর্শে পদ্মা পুরাণ গান আয়োজন করি। এর আগেও আমাদের ঘর থেকে একাধিকবার সাপ মারা হয়েছে। এরপরও সাপের উপদ্রব না কমায় বাধ্য হয়ে এই গানের আয়োজন করি। কিন্তু গান চলাকালে এক যুবক এসে বন্ধ করতে বললে শিল্পীরা তাৎক্ষণিক গান থামিয়ে দেন। পরে পরদিন সকালে সীমিত পরিসরে অনুষ্ঠান শেষ করা হয়।”
স্থানীয় ছয়জন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের মধ্যে দুই নারী ও চার পুরুষ অনুষ্ঠান বন্ধের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের ভাষ্য, ‘পদ্মা পুরাণ’ গ্রামবাংলার পুরোনো লোকসংস্কৃতির একটি অংশ। এতে কুসংস্কার বা অবৈধ কর্মকাণ্ডের অভিযোগ থাকলে তা যাচাই করা যেতে পারে। তবে কোনো ধরনের তদন্ত বা আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত না নিয়ে ঐতিহ্যবাহী লোকজ আয়োজন বন্ধ করে দেওয়া উচিত নয়। তবে তারাগুনিয়া বাজার জামে মসজিদের ইমাম মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, “ইসলামে এ ধরনের গান-বাজনার কোনো অস্তিত্ব নেই। ছেলেরা মেয়ে সেজে অশালীনভাবে নাচ-গান করেছে, যা কোনোভাবেই ইসলাম সমর্থন করে না।”
তারাগুনিয়া শাহী মসজিদের খতিব মোহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, “পদ্মা পুরাণ গান ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী কোনো গান নয়। এটি মানুষের ভুল ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। সাপের হাত থেকে বাঁচতে গান করে রেহাই পাওয়া যায় না। এসব কর্মকাণ্ড মানুষকে শিরকের দিকে ধাবিত করতে পারে। অন্যদিকে অনুষ্ঠানের শিল্পী মো. খাইরুল ইসলাম বলেন, “মা মনসার গান কেউ নিয়মিত আয়োজন করে না। মানুষ অতিমাত্রায় বিপদে পড়লে এ ধরনের গান আয়োজন করে। তাই এটিকে অবজ্ঞা করা উচিত নয়। অনুষ্ঠান বন্ধের দাবি জানানো শরিফুল ইসলাম শরীফ বলেন, “আমাদের গ্রামেই কিছু ছেলে মেয়ে সেজে অশালীন অঙ্গভঙ্গি করে নৃত্য করছিল। আমার কাছে মনে হয়েছে, পদ্মা পুরাণ গান সরাসরি শিরকের সমতুল্য। গ্রামবাসীকে শিরক থেকে বাঁচাতে আমি বাধা দিয়েছি। কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার কোনো উদ্দেশ্য আমার ছিল না। পরে শনিবার সকালে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সীমিত পরিসরে পুনরায় ‘পদ্মা পুরাণ’ গান পরিবেশনের সুযোগ দেওয়া হয়। এরপর নির্ধারিত আয়োজন সম্পন্ন হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার পাশাপাশি গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতিও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। কোনো সাংস্কৃতিক আয়োজন নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত।
এ বিষয়ে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ বলেন, “গানের নামে কোনো ধরনের চাঁদাবাজি বা অবৈধ অর্থ লেনদেনের ঘটনা না ঘটলে এ ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করা আইনসম্মত নয়। শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী লোকজ গান বন্ধ হোক, সেটি প্রশাসনও চায় না। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন